প্রতিনিধি, চন্দননগর: রাজ্যে বিজেপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর এ বারই প্রথম চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী জগদ্ধাত্রী পুজো। তাই এই উৎসবকে ঘিরে পর্যটন, দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা এবং উন্নত পরিষেবার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছে রাজ্য সরকার ও প্রশাসন। রিভার ক্রুজ়, বিশেষ ফেরি পরিষেবা, প্রবীণ নাগরিকদের জন্য প্রতিমা দর্শনের বিশেষ ব্যবস্থা, স্বাস্থ্য পরিষেবা এবং বিশেষ মোবাইল অ্যাপ—এ বার চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোকে কেন্দ্র করে একাধিক নতুন উদ্যোগের পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে, সাম্প্রতিক সময়ে চোরবাগানের ঘটনায় যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে, তার পুনরাবৃত্তি এড়াতে ভিড় নিয়ন্ত্রণ ও সুরক্ষা ব্যবস্থার উপরেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে।
চন্দননগরের
জগদ্ধাত্রী পুজোর খ্যাতি শুধু বাংলাতেই সীমাবদ্ধ নয়, দেশ-বিদেশেও ছড়িয়ে রয়েছে এই উৎসবের
পরিচিতি। প্রতিমার অভিনব রূপ, ঐতিহ্যবাহী পুজো এবং চোখধাঁধানো আলোকসজ্জা দেখতে প্রতি
বছর লক্ষ লক্ষ মানুষের সমাগম হয় ফরাসডাঙায়। পঞ্চমী থেকে দশমী পর্যন্ত শহরের বিভিন্ন
পুজো মণ্ডপে দর্শনার্থীদের ঢল নামে। বিপুল জনসমাগমের জেরে শহরের রাস্তাঘাট, যান চলাচল
এবং দর্শনার্থীদের নিরাপত্তা সামলানো প্রশাসনের কাছে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়ায়। সেই
কথা মাথায় রেখেই এ বার আগাম প্রস্তুতিতে জোর দেওয়া হচ্ছে।
চন্দননগরের
বিধায়ক দীপাঞ্জন গুহ জানিয়েছেন, জগদ্ধাত্রী পুজোকে আরও সুষ্ঠু, নিরাপদ ও আকর্ষণীয় করে
তুলতে একাধিক পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে। বিশেষ করে পর্যটকদের সুবিধা বাড়ানো এবং চন্দননগরের
ঐতিহ্যকে আরও বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরার উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
পর্যটনে
বাড়তি গুরুত্ব, থাকছে রিভার ক্রুজ়
চন্দননগরের
গঙ্গার তীর, ঐতিহাসিক স্থাপত্য এবং আলোকসজ্জার আকর্ষণকে কাজে লাগিয়ে পর্যটনের নতুন
সম্ভাবনা তৈরি করতে চাইছে প্রশাসন। সেই লক্ষ্যেই রিভার ক্রুজ় ও বিশেষ ফেরি পরিষেবার
পরিকল্পনা রয়েছে। এর মাধ্যমে দর্শনার্থীরা জলপথে চন্দননগরের সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ
পেতে পারেন। পুজোর সময় যানজটের চাপ কমানোর পাশাপাশি পর্যটকদের অভিজ্ঞতাকে আরও আকর্ষণীয়
করে তোলাও এই উদ্যোগের অন্যতম উদ্দেশ্য।
প্রবীণদের
জন্য বিশেষ দর্শনের ব্যবস্থা
পুজোর ভিড়ে
বয়স্ক মানুষদের পক্ষে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকা কিংবা এক মণ্ডপ থেকে অন্য মণ্ডপে যাতায়াত
করা অনেক সময় কঠিন হয়ে পড়ে। তাঁদের কথা মাথায় রেখে প্রবীণ নাগরিকদের জন্য বিশেষ দর্শনের
ব্যবস্থা করার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। এর ফলে প্রবীণ দর্শনার্থীরা যাতে তুলনামূলক স্বাচ্ছন্দ্যে
প্রতিমা দর্শন করতে পারেন, সেই দিকটি গুরুত্ব পাবে।
স্বাস্থ্য
পরিষেবা ও বিশেষ অ্যাপ
লক্ষ লক্ষ মানুষের
সমাগমের কথা মাথায় রেখে চিকিৎসা পরিষেবার দিকেও বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে। পুজোর সময়ে
কোনও দর্শনার্থী অসুস্থ হয়ে পড়লে যাতে দ্রুত চিকিৎসার ব্যবস্থা করা যায়, সে জন্য স্বাস্থ্য
পরিষেবা ও জরুরি সহায়তার উপরে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি, দর্শনার্থীদের প্রয়োজনীয়
তথ্য পৌঁছে দিতে বিশেষ মোবাইল অ্যাপ চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে। পুজো মণ্ডপ, যাতায়াত এবং
অন্যান্য প্রয়োজনীয় পরিষেবা সংক্রান্ত তথ্য কী ভাবে সহজে পাওয়া যাবে, তা এই উদ্যোগের
ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
চোরবাগানের
ঘটনার পুনরাবৃত্তি রুখতে সতর্ক প্রশাসন
উৎসবের আনন্দের
মধ্যে কোনও অপ্রীতিকর ঘটনা যাতে না ঘটে, সে জন্য নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও জোরদার করার
উপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। চোরবাগানের ঘটনার পর ভিড় নিয়ন্ত্রণ, দর্শনার্থীদের চলাচল
এবং জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত পদক্ষেপ করার বিষয়গুলি বিশেষ তাৎপর্য পেয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে
বিপুল জনসমাগম সামাল দিতে পুলিশ ও প্রশাসনের সমন্বয়, প্রয়োজনীয় নজরদারি এবং জরুরি পরিষেবার
প্রস্তুতি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে।
এ ছাড়াও, দর্শনার্থীদের
যাতায়াত, যানবাহন নিয়ন্ত্রণ এবং শহরের বিভিন্ন এলাকায় ভিড় সামলানোর জন্য পরিকল্পিত
ব্যবস্থাপনার প্রয়োজন রয়েছে। পুজোর দিনগুলিতে সাধারণ মানুষ যাতে নিরাপদে মণ্ডপ দর্শন
করতে পারেন এবং জরুরি প্রয়োজনে দ্রুত সহায়তা পান, তা নিশ্চিত করাই প্রশাসনের অন্যতম
লক্ষ্য।
সব মিলিয়ে,
চন্দননগরের জগদ্ধাত্রী পুজোকে এ বার শুধু ধর্মীয় উৎসবের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে পর্যটনের
অন্যতম আকর্ষণ হিসেবে তুলে ধরতে চাইছে সরকার। রিভার ক্রুজ় থেকে বিশেষ ফেরি পরিষেবা,
প্রবীণদের জন্য দর্শনের সুবিধা থেকে স্বাস্থ্য পরিষেবা—একাধিক উদ্যোগের মাধ্যমে পুজোর
অভিজ্ঞতাকে আরও উন্নত করার পরিকল্পনা রয়েছে। তবে এই উদ্যোগগুলির বাস্তবায়ন এবং নিরাপত্তা
ব্যবস্থার কার্যকারিতার উপরেই নির্ভর করবে, কতটা নির্বিঘ্নে লক্ষ লক্ষ দর্শনার্থী উপভোগ
করতে পারবেন চন্দননগরের ঐতিহ্যবাহী জগদ্ধাত্রী পুজো।




